নিজস্ব প্রতিবেদক :
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার মীরপুর ইউনিয়নের উত্তর গড়গড়ি গ্রামে এক ব্যক্তিকে হত্যার পর প্রতিপক্ষের অন্তত পাঁচটি বাড়িঘরে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। এসব হামলায় বসতঘর ও খামার থেকে গবাদিপশু, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা লুট করা হয়েছে বলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো দাবি করেছে। এ নিয়ে পাল্টা মামলা হলেও মূল ঘটনায় নিহত ব্যক্তির পরিবারের দাবি, সাজানো মামলায় তাঁদের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে।

ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পিয়ারা বেগম, হিরন মিয়া, রাজিক মিয়া, আশিক মিয়া ও আতিক মিয়ার মোট পাঁচটি বাড়িতে এ হামলা চালানো হয়। হামলা ও ভাঙচুরের শিকার একই ছাদের নিচে কাজল মিয়া, ফুল মিয়া, সোনা মিয়া, সুজন মিয়া, শিপন মিয়া ও রিপন মিয়া বসবাস করতেন।
সোমবার সরেজমিনে উত্তর গড়গড়ি গ্রামে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িগুলোর চিত্র দেখা যায়। পিয়ারা বেগমের ঘরের দরজাসমূহ ভাঙা ও অনুপস্থিত অবস্থায় রয়েছে। ভেতরে ঘরের বিভিন্ন অংশ ভাঙাচোরা এবং আসবাবপত্র যত্রতত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। ঘর থেকে আসছিল পচে যাওয়া মৃত মুরগির দুর্গন্ধ। অন্য চার ঘরের অবকাঠামোতেও ব্যাপক ভাঙচুরের চিহ্ন স্পষ্ট। ঘটনার পর থেকে এসব পরিবারের পুরুষ সদস্যরা আত্মগোপনে থাকায় মহিলারা চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন এবং আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।

হামলা ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে সুনামগঞ্জ আদালত ও জগন্নাথপুর থানায় মোট চারটি পৃথক লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, সুনামগঞ্জে একটি সিআর মামলা (মামলা নং- ১৮৮/২০২৬) দায়ের করেছেন মোছা. ফাতেমা বেগম (৩৮)। এ মামলায় আসামি করা হয়েছে স্থানীয় ১৫ জনকে।
অভিযুক্তরা হলেন— আজমত আলী, আওলাদ আলী, জুনাব আলী, বদর উদ্দিন, জামাল মিয়া, গিয়াস উদ্দিন, আরশ আলী, মউরশ আলী, রয়েল মিয়া, রুবেল মিয়া, ফজল মিয়া, আলী হোসেন, আজাদ মিয়া, কয়েছ মিয়া ও জুবায়ের মিয়া।
মামলার আরজিতে ফাতেমা বেগম অভিযোগ করেন, গত ১২ জুলাই সকালে ১ নম্বর আসামি আজমত আলীর প্ররোচনায় সংঘবদ্ধ আসামিরা ঘরে ঢুকে দরজা-জানালা, ফ্রিজ ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। এ সময় ঘরের ড্রয়ার ভেঙে নগদ ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা, দেড় ভরি স্বর্ণ ও জমির দলিল লুট করা হয়। পাশাপাশি গোয়ালঘর ও খামার থেকে ১২টি গরু, ১৭টি ছাগল, ৭টি ভেড়াসহ প্রচুর হাঁস-মুরগি ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

অপর ক্ষতিগ্রস্ত পিয়ারা বেগম বলেন, "আমাদের খামার ও ঘর থেকে ১২টি গরু, ১২ শ' হাঁস, ৬ ভরি স্বর্ণ এবং নগদ ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা লুট করে নেওয়া হয়েছে। বসতঘর ও ফ্রিজ ভাঙচুর করায় এতে আমাদের প্রায় ২ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। আমরা এখন ভিটামাটি হারিয়ে আত্মীয়ের বাড়িতে থাকছি।"
এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, সংঘর্ষের মূল ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল ধানের বীজতলা নষ্ট করা ও সীমানা বিরোধকে কেন্দ্র করে। উত্তর গড়গড়িয়াকান্দি গ্রামে জমির আলীর বীজতলার চারা দুলাল মিয়ার গরু খেয়ে ফেলাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মারামারি হয়। এর জের ধরে গত ১০ জুলাই সংঘর্ষে প্রতিপক্ষের আঘাতে গুরুতর আহত হন সেলিম মিয়া (৪১)। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। ওই ঘটনায় নিহতের ভাই মো. ফজলু মিয়া বাদী হয়ে ২৩ জনের নাম উল্লেখ করে জগন্নাথপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। সম্প্রতি ওই মামলার এজাহারনামীয় ৮ জন আসামিকে পঞ্চগড় থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
তবে বিবাদী পক্ষের বাড়িঘরে হামলা ও লুটপাটের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নিহত সেলিম মিয়ার চাচাতো ভাই বদর উদ্দিন। উল্টো দাবি করে তিনি বলেন, "সীমানা বিরোধের কারণে তারা কাঁটাতার দিয়ে আমাদের হাওরে যাওয়ার পথ বন্ধ করেছিল। গরু দিয়ে বীজতলা নষ্টের প্রতিবাদ করায় আমার চাচাতো ভাই সেলিমকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়। আমরা যখন লাশ ও গুরুতর আহত স্বজনদের নিয়ে হাসপাতাল-থানায় দৌড়াদৌড়ি করছি, তখন উল্টো আমাদের নামে মিথ্যা মামলা সাজানো হয়েছে। নিজেদের গরু-বাছুর আগে থেকে সরিয়ে রেখে আমাদের ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, যার প্রমাণ রয়েছে। গ্রামে আমরা সংখ্যায় কম, স্বজন হারানোর শোকে থাকা অবস্থায় কোনো লুটপাটের প্রশ্নই ওঠে না।"
জগন্নাথপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম বলেন, আদালত থেকে দুটি অভিযোগের তদন্তের নির্দেশনা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একটি মামলা পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থা (ডিবি) এবং ফাতেমা বেগমের দায়ের করা অভিযোগটি জগন্নাথপুর থানা পুলিশ তদন্ত করছে। হত্যা মামলার আট আসামিকে গ্রেপ্তারের সত্যতা নিশ্চিত করে তিনি জানান, আদালতের নির্দেশনা মেনে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত চালানো হচ্ছে। তদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কার্যালয়ঃ ডাকবাংলো রোড, জগন্নাথপুর আ/এ, জগন্নাথপুর পৌরসভা, জগন্নাথপুর সুনামগঞ্জ।
যোগাযোগ : (মোবাইল ও হোয়াটস্অ্যাপ) 𝟎𝟏𝟕𝟏𝟏𝟏𝟎𝟒𝟒𝟒𝟖, 𝟎𝟏𝟕𝟏𝟔𝟎𝟐𝟑𝟏𝟒𝟎, 𝟎𝟏𝟕𝟏𝟐𝟖𝟎𝟎𝟔𝟔𝟕
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত