
নিজস্ব প্রতিবেদক :
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর টানা তিন দিনের প্রবল বর্ষণে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার ১২টি হাওরের চিত্র এখন অত্যন্ত নাজুক। উপজেলার প্রধান শস্যভাণ্ডার নলুয়ার হাওরসহ সবকটি হাওরে আকস্মিক জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় মাঠের অর্ধেকেরও বেশি সোনালী পাকা ধান এখন পানির নিচে। মূলত গত সোমবার রাত থেকে শুরু হওয়া এই অতিবৃষ্টির কারণে হাওরগুলোতে দ্রুত পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পায়, যা এখন কৃষকদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। চোখের সামনে পাকা ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এবং যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ধান কাটার একমাত্র ভরসা কম্বাইন হারভেস্টার মেশিনগুলো অকেজো হয়ে পড়ায় ফসল ঘরে তোলা নিয়ে কৃষকদের মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা ও হাহাকার বিরাজ করছে।
বুধবার সরেজমিনে হাওর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, জলাবদ্ধতার কারণে যান্ত্রিক সহায়তা পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার উপক্রম। কৃষকদের অভিযোগ, সরকারিভাবে হারভেস্টার মেশিনের ভাড়া ২০০ টাকা নির্ধারিত থাকলেও স্থানীয় দালাল চক্রের কারণে ঠিক সময়ে ধান গোলায় তুলতে পারেননি। তারা ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া দাবি করে। বর্তমানে পানির কারণে মেশিনগুলো ক্ষেতে নামতে পারছে না।
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, এবার উপজেলায় ২০ হাজার ৪২৩ হেক্টর জমিতে ধান চাষ করা হয়েছিল। যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১ লক্ষ ২৮ হাজার ৫১০ মেট্রিক টন। ইতিমধ্যে ৫৫ শতাংশ ধান কাটা শেষ হলেও বাকি ৪৫ শতাংশ পাকা ধান এখন পানির নিচে। একদিকে মাঠের ফসল তলিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে মেশিন নামাতে না পারায় হাতে কাটা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু সেখানেও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তীব্র শ্রমিক সংকট। আগে যেখানে শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ছিল ৬০০-৭০০ টাকা, এখন পানির নিচে ধান কাটতে ১,৫০০ টাকা দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।
নলুয়ার হাওরের কৃষক আরশাদ আলী আক্ষেপ করে জানান, তার ২০ কেদার জমির মধ্যে মাত্র ৩ কেদার কাটতে পেরেছেন। কৃষক মিলাদ মিয়া ৩০ কেদার জমিতে ধান চাষ করেছিলেন, যার মধ্যে ২০ কেদার পাকা ধানই এখন পানির নিচে। একইভাবে কৃষক রুমন মিয়া জানান, তার ৩০ কেদার জমির মধ্যে মাত্র ১৭ কেদার নিজেরা কোনোমতে কাটতে পেরেছেন; শ্রমিকরা এখন ১৫০০ টাকা মজুরি চাচ্ছে। কৃষক দিলোয়ার হোসেন লিলু মিয়ার ২০ কেদার জমির মধ্যে ১৫ কেদারই এখন পানির নিচে।
অনেক কৃষক ধান কাটার পর বৃষ্টির কারণে তা বাড়িতে নিতে না পারায় মাঠেই ধানে অঙ্কুর গজিয়ে নষ্ট হচ্ছে। কৃষক আকবর হোসেন ও আমির হোসেনের মতো শত শত কৃষক এখন সর্বস্বান্ত হওয়ার পথে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ কাওসার আহমেদ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “সোমবার রাত থেকে অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় যান্ত্রিক উপায়ে ধান কাটায় সমস্যা হচ্ছে। আমরা কৃষকদের এই দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।”
জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ ইসলাম উদ্দিন বলেন, “গত কয়েক দিনের অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সাথে দেখছি। জলাবদ্ধতা নিরসন এবং দ্রুত পাকা ধান ঘরে তোলার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।”